ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তহবিলের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিয়ে সদ্য সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ ও নতুন প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের দুই রকম তথ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। মো. শফিকুল ইসলাম খান দাবি করে বলেছেন, করপোরেশনের ফান্ডে মাত্র ২৫ কোটি টাকা রয়েছে। আর মোহাম্মদ এজাজ জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্ব ছাড়ার দিন ১০ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বেশি রেখে গেছেন।
সাবেক-বর্তমান দুই প্রশাসকের এই বিপরীত দাবির মধ্যেই গত আড়াই বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে করপোরেশনের ব্যয় দ্রুত বেড়ে গিয়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আগের অর্থবছরে করপোরেশনের আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত থাকলেও গত দেড় বছরে ব্যয় বেড়েছে।
ডিএনসিসির হিসাব বিভাগের নিজস্ব তহবিলের ক্যাশবুকের স্থিতি বিবরণীর খসড়া নথিতে দেখা যায়, গত ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করপোরেশনের মোট স্থিতি ছিল ৪২৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং বিভিন্ন তহবিলে এফডিআর ছিল ৮২৫ কোটি টাকা। এই দুই হিসাব মিলিয়ে মোট অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা—যা সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে স্থিতি টাকার বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৪২৫ কোটি টাকার বড় একটি অংশ বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিলে সংরক্ষিত। এর মধ্যে অবসর ভাতা ও অবসর সুবিধা তহবিলে রয়েছে ৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে ৩০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। সবচেয়ে বড় অংশ ২৪১ কোটি ৬ লাখ টাকা রয়েছে জামানত তহবিলে।
অন্যদিকে ৮২৫ কোটি টাকার এফডিআরের মধ্যে সাধারণ তহবিলে ৬৪২ কোটি টাকা, জামানত তহবিলে ৭০ কোটি টাকা, শিক্ষা বৃত্তি তহবিলে ১০ কোটি টাকা, পেনশন তহবিলে ৫৬ কোটি টাকা এবং সাধারণ ভবিষ্য তহবিলে ৪৭ কোটি টাকা রয়েছে।
ডিএনসিসির হিসাব বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থিতির ৪২৫ কোটি টাকার বড় অংশ পরিচালন বা উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়। একইভাবে এফডিআরের অর্থও সরাসরি নগদ ব্যয়ের জন্য ব্যবহার করা যায় না। শুধু আপদকালীন সময়ে এফডিআরের সাধারণ তহবিলের টাকা ব্যবহার করা হয়।
মিল্টন কেন বলছেন ২৫ কোটি?
প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান সম্প্রতি বলেছেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে এখন ভঙ্গুর অবস্থা। সাবেক প্রশাসক শেষ অফিস করে ৩৪টি ফাইল সই করে গেছেন। যেখানে ফান্ড দিতে হবে, বিল দিতে হবে। আসলে কোনো টাকাই নাই। ২৫ কোটি টাকা আছে।’
ডিএনসিসি তহবিল নিয়ে সাবেক প্রশাসকের দেওয়া এ বক্তব্য ঘিরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। তবে সেই বিভ্রান্তি দূর করতে প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি জানান, দায়িত্ব হস্তান্তরের দিন করপোরেশনের ২৬টি ব্যাংক হিসাব মিলিয়ে ১,২৬০ কোটি টাকা থাকার যে দাবি করা হয়েছে, তা বাস্তবে নগদ ব্যবহারযোগ্য তহবিলের প্রতিফলন নয়। কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা ও বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল পরিশোধ করা হয় ডিএনসিসির সাধারণ তহবিল থেকে। তিনি ২৫ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাধারণ তহবিলে মাত্র ২৫ কোটি টাকা নগদ ছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিলে ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) হিসেবে ৮২৫ কোটি টাকা সংরক্ষিত ছিল, যা আপদকালীন দায় মেটানোর জন্য রাখা হয়েছে।
নতুন প্রশাসকের দাবি, ২০২৩–২৪ অর্থবছর শেষে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন তহবিলে এফডিআর ছিল ৮২৫ কোটি টাকা। ১ জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ১,১৭৮ কোটি টাকা। ফলে ওই সময়ে মোট নগদ প্রবাহ দাঁড়ায় ১,৭৭৫ কোটি টাকা।
প্রশাসকের দাবি, সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর উচ্চাভিলাষী বাজেট ও বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করে গত ৩০ জুন পর্যন্ত ১,৪৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করেন। এতে ১ জুলাই ২০২৫ তারিখে নগদ স্থিতি নেমে আসে ৩৩৬ কোটিতে। পরে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হয় ৮২০ কোটি টাকা, ফলে ৩০ জানুয়ারি নগদ স্থিতি দাঁড়ায় ১,১৫৬ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে গত ১ জুলাই থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাবেক প্রশাসক বিভিন্ন প্রকল্পে ১,১৩১ কোটি টাকা ব্যয় করেন। এতে তার দায়িত্ব গ্রহণের সময় সাধারণ তহবিলে নগদ স্থিতি কমে মাত্র ২৫ কোটিতে নেমে আসে, যা ডিএনসিসির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
প্রশাসক অভিযোগ করেন, সাবেক প্রশাসক বিভিন্ন নির্দিষ্ট তহবিলের অর্থ ও এফডিআরের টাকা একত্র করে ১,২৬০ কোটি টাকার হিসাব প্রচার করেছেন, যা বিভ্রান্তিকর। তিনি আরও জানান, দায়িত্ব ছাড়ার আগে সাবেক প্রশাসক ৩৬টি ঠিকাদারি বিল অনুমোদন করে গেছেন, যার মাধ্যমে প্রায় ৪২ কোটি টাকা পরিশোধের দাবি উঠেছে। এসব নথি বর্তমানে যাচাই করা হচ্ছে।
উদ্বৃত্ত থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘাটতিতে
ডিএনসিসির হিসাব বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে করপোরেশন আয়-ব্যয়ের হিসাবে উদ্বৃত্তে ছিল। ওই অর্থবছরে আয় হয়েছিল ১ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা এবং ব্যয় হয় ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা। ফলে বছর শেষে উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৯৫ কোটি টাকা।
তবে পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫ এ চিত্র পাল্টে যায়। ওই বছর মোট আয় ছিল ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৩৮ কোটি টাকা। ফলে আয়ের তুলনায় ব্যয় প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বেশি হয়, যা বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই সময়ে আয় হয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, কিন্তু ব্যয় হয়েছে ৮১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসেই আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়েছে প্রায় ৬১ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য থাকা জরুরি। যদি ধারাবাহিকভাবে ব্যয় আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।’
তিনি আরও বলেন, 'এখানে আয়-ব্যয়ের তারতম্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পুরো বিষয়টি অডিটের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা দরকার।'
দুই প্রশাসকের ভিন্ন দাবি
ডিএনসিসির নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন গত ৩ মার্চ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, করপোরেশনের ফান্ডে বর্তমানে মাত্র ২৫ কোটি টাকা রয়েছে। তিনি জানান, প্রতি মাসে বেতন বাবদ প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ফলে হাতে থাকে প্রায় ১২ কোটি টাকা। এই অবস্থায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ফেসবুকে নিজের আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করে লেখেন, ‘দায়িত্ব ছাড়ার দিন ১০ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসির ২৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট ১ হাজার ২৬০ কোটি ১৫ লাখ ৫১ হাজার ৩১১ টাকা ৬০ পয়সা জমা ছিল। আমি একটি সমৃদ্ধ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রেখে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছি।’
এসব বিষয়ে নবনিযুক্ত প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেছেন, সাবেক প্রশাসকের দেওয়া তথ্য তার নজরে এসেছে। তিনি ডিএনসিসির রাজস্ব ও হিসাব বিভাগের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন। সাবেক প্রশাসক যে অঙ্কের কথা বলেছেন, তার মধ্যে স্থায়ী সম্পদও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা তিনি নগদ তহবিলের হিসাবে ধরবেন না।
ডিএসসিসির ৬ মাসে এফডিআর ভেঙে ব্যয় ২০৪ কোটি টাকা
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা যায়, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ডিএসসিসির আয়-ব্যয় সমন্বয়ের পর ৮২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা উদ্বৃত্ত ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) আয়ের চেয়ে ১০২ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ছয় মাসে আগের বছরের তুলনায় আয় বাড়লেও ব্যয় দ্বিগুণ বেড়ে ২০৪ কোটি টাকা হয়েছে।