দুধ, মাছ, মাংস বা টাটকা সবজি ছাড়া বাকি সব খাবারই কি আপনি নিশ্চিন্তে রান্নাঘরের তাকে বা প্যান্ট্রিতে রাখেন? অনেকেই তাই করেন। কিন্তু সব শুকনো বা প্যাকেটজাত খাবার যে ঘরের তাপমাত্রায় নিরাপদে রাখা যায়, তা কিন্তু নয়। ভুল সংরক্ষণে খাবারের স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে পারে, এমনকি খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খাদ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু খাবার দেখতে শুকনো বা দীর্ঘদিন ভালো থাকে মনে হলেও খোলার পর সেগুলো ফ্রিজে বা ফ্রিজারে রাখা বেশি নিরাপদ। আবার কিছু খাবার প্যান্ট্রিতে রাখলে দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
নিচে এমন কিছু খাবারের কথা তুলে ধরা হলো, যেগুলো প্যান্ট্রিতে না রেখে অন্যভাবে সংরক্ষণ করা ভালো।
পাউরুটি
অনেকে পাউরুটি রান্নাঘরেই ফেলে রাখেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সতেজ রাখতে চাইলে ফ্রিজে রাখা সবচেয়ে ভালো। বায়ুরোধী (Air tight) ব্যাগ বা পাত্রে রেখে ফ্রিজে রাখলে ছত্রাক পড়া ও শক্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
তবে, ফ্রিজে রাখলে পাউরুটি দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে খাওয়ার আগে হালকা গরম করে নিলেই স্বাদ ঠিক থাকবে।
খাঁটি সিরাপ বা মধু
স্বাদযুক্ত সিরাপ রান্নাঘরের তাকে রাখা গেলেও খাঁটি সিরাপ বা মধু খোলার পর ফ্রিজে রাখতে হয়। এতে ছত্রাক পড়া ঠেকানো যায় এবং স্বাদ ও রং ঠিক থাকে।
বাদাম
কাঁচা বা ভাজা বাদামে প্রাকৃতিক তেল থাকে। ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘদিন রাখলে এই তেল অক্সিডাইজ হয়ে বাজে গন্ধ ও স্বাদ তৈরি করতে পারে। তাই বেশি পরিমাণে কিনলে ফ্রিজে সংরক্ষণ করাই ভালো।
মাখন
অনেকে মাখন টেবিলে বা রান্নাঘরে রেখে ব্যবহার করেন। কিন্তু এটি নষ্ট হওয়ার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ খাবার। লবণযুক্ত বা লবণহীন যাই হোক, মাখন ফ্রিজেই রাখা উচিত। ঘরের তাপমাত্রায় বেশি সময় থাকলে এতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে।
টমেটো সস
বোতল বা ক্যান যেটাতেই থাকুক, একবার খোলার পর টমেটো সস অবশ্যই ফ্রিজে রাখতে হবে। বাতাস ও ব্যবহৃত চামচের মাধ্যমে জীবাণু ঢুকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রিজারভেটিভবিহীন বাদামের মাখন
প্রাকৃতিক বাদামের মাখনে তেল আলাদা হয়ে যায়। খোলার পর ফ্রিজে রাখলে তেল উপরে উঠে আসা কমে এবং বাজে স্বাদ হওয়ার ঝুঁকিও কমে।
সম্পূর্ণ শস্যের আটা
লাল আটা বা সম্পূর্ণ শস্য থেকে তৈরি আটায় প্রাকৃতিক তেল থাকে। তাপ, আলো ও বাতাসের সংস্পর্শে এলে তা দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই বায়ুরোধী পাত্রে ফ্রিজে রাখা ভালো। গম ছাড়াও স্পেল্ট, ওটস, ভুট্টা বা রাইয়ের আটার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
কিছু রান্নার তেল
সাধারণ সয়াবিন বা ভেজিটেবল অয়েল রান্নাঘরের তাকে রাখা যায়। তবে নারকেল তেল, তিসির তেল, তিলের তেল বা কাঠবাদাম, আখরোটের মতো বাদামের তেল খোলার পর ফ্রিজে রাখা ভালো। এগুলো দ্রুত বাজে গন্ধ ধারণ করতে পারে।
আচার
আচারে লবণ, তেল বা ভিনেগার থাকলেও খোলার পর ফ্রিজে রাখা উচিত। বিশেষ করে যেগুলো তাপপ্রক্রিয়াজাত নয়, সেগুলো দ্রুত নষ্ট হতে পারে। রান্নাঘরের তাকে রাখলে কড়কড়ে ভাব ও স্বাদ কমে যেতে পারে।
খোলা সস ও কন্ডিমেন্ট
সরিষা, রসুন বা কেচাপসহ নানা ধরনের সস অনেকদিন ধরে ব্যবহার করা হয়। বাজারে ঘরের তাপমাত্রায় রাখা হলেও খোলার পর ফ্রিজে রাখলে রং, স্বাদ ও ঘনত্ব ভালো থাকে এবং নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।
প্রাকৃতিক উপাদানসমৃদ্ধ স্প্রেড ও পেস্ট
যেসব স্প্রেড বা পেস্টে কৃত্রিম সংরক্ষণকারী কম থাকে, সেগুলো খোলার পর ফ্রিজে রাখা নিরাপদ। এতে জীবাণু বৃদ্ধির ঝুঁকি কমে।
কেন সঠিক সংরক্ষণ জরুরি
খাবার যদি প্রয়োজনীয় ঠান্ডা তাপমাত্রায় না রাখা হয়, তবে তা বিপজ্জনক তাপমাত্রা অঞ্চলে চলে যেতে পারে। এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। আবার অনেক সময় অসুস্থ না হলেও স্বাদ, গন্ধ, রং ও গঠনে পরিবর্তন আসে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া তুলনামূলক উষ্ণ ও আর্দ্র হওয়ায় খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি। তাই প্যাকেটের গায়ে সংরক্ষণ নির্দেশনা ভালো করে পড়া এবং খোলার পর কোন খাবার কোথায় রাখা উচিত, তা জানা জরুরি।
সব শুকনা বা প্যাকেটজাত খাবার রান্নাঘরের তাকে রাখা নিরাপদ নয়। কিছু খাবার খোলার পর ফ্রিজে বা ফ্রিজারে রাখলে তা দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে। ছোট একটি অভ্যাস পরিবর্তন আপনার পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। সচেতন সংরক্ষণই নিরাপদ খাবারের প্রথম শর্ত।
সূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট