বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করতে পারেন। তবে অনেক সময় ভিসা প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ভ্রমণ পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু এমন কিছু দেশ আছে যেখানে বাংলাদেশি নাগরিকরা ভিসা ছাড়াই বা সহজ প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করতে পারেন।
বাংলাদেশি পাসপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন অভিবাসন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে ইস্যু করা হয়। জন্মসূত্রে, বংশসূত্রে বা নাগরিকত্ব পাওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকরা এই পাসপোর্ট পেতে পারেন।
বাংলাদেশ ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি আধুনিক বায়োমেট্রিক ই-পাসপোর্ট চালু করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এবং বিশ্বের ১১৯তম দেশ হিসেবে সব যোগ্য নাগরিকের জন্য ই-পাসপোর্ট চালু করে।
ই-পাসপোর্টে উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন নিরাপত্তা সুবিধা যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণের জন্য ইলেকট্রনিক চিপ
- রঙিন ছবি, আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিস স্ক্যান এবং ডিজিটাল স্বাক্ষর
- আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী প্রযুক্তি
- হোলোগ্রাম ও ওয়াটারমার্কসহ প্রায় ৪১ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
- পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উপাদান
এই প্রযুক্তির কারণে বিদেশ ভ্রমণের সময় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়া দ্রুত ও নিরাপদ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ছে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবস্থার ইতিহাস কয়েকটি ধাপে বিকশিত হয়েছে।
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশের মাধ্যমে প্রথম পাসপোর্ট চালু হয়। সে সময় পাসপোর্ট ছিল হাতে লেখা।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট চালু করা হয়।
২০১৫ সালে হাতে লেখা সব পাসপোর্ট বাতিল করা হয়।
২০২০ সালে উন্নত নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক ই-পাসপোর্ট চালু করা হয়।
এ ছাড়া ১৯৭২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ভারত ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ একটি বিশেষ মেরুন রঙের ভারত-বাংলাদেশ স্পেশাল পাসপোর্ট চালু রেখেছিল। পরে আন্তর্জাতিক নিয়ম পরিবর্তনের কারণে এটি বন্ধ করা হয়।
বাংলাদেশি পাসপোর্টের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের সুযোগ তুলনামূলক সীমিত হলেও বেশ কয়েকটি দেশে ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা পাওয়া যায়। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকরা তুলনামূলক সহজে ভ্রমণ করতে পারেন।
ই-পাসপোর্ট থাকলে ভ্রমণ আরও সহজ হয়। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন দ্রুত সম্পন্ন করা যায় এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আরও নিরাপদ হয়।
- যে দেশে যাচ্ছেন সেখানে ভিসা নীতিমালা যাচাই করা
- ভ্রমণ সতর্কতা বা সরকারি নির্দেশনা সম্পর্কে আপডেট থাকা
- ভিসামুক্ত বা অন-অ্যারাইভাল সুবিধা থাকলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসামুক্ত দেশ
বাংলাদেশি নাগরিকরা নিচের দেশগুলোতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করতে পারেন।
বাহামাস – ৪ সপ্তাহ
বার্বাডোস – ৬ মাস
ডোমিনিকা – ৬ মাস
ফিজি – ৪ মাস
গ্রেনাডা – ৩ মাস
গাম্বিয়া – ৯০ দিন
হাইতি – ৩ মাস
জ্যামাইকা – ৬ মাস
কেনিয়া – ৯০ দিন
কিরিবাতি – ৯০ দিন
লেসোথো – ৯০ দিন
মাইক্রোনেশিয়া – ৩০ দিন
রুয়ান্ডা – ৩০ দিন
সামোয়া – ৬০ দিন
সেশেলস – ৩ মাস
সিয়েরা লিওন – ৩ মাস
সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস – ৩ মাস
সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনস – ৩ মাস
ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো – ৩০ দিন
ভানুয়াতু – ৩০ দিন
তবে আন্তর্জাতিক চুক্তি, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা সাময়িক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে এই তালিকা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা পাওয়া দেশ
কিছু দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই ভিসা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য এমন কয়েকটি দেশ হলো- বলিভিয়া, বুরুন্ডি, কম্বোডিয়া, কেপ ভার্দে, কমোরোস, জিবুতি, গিনি বিসাউ, মালদ্বীপ, মোজাম্বিক, নেপাল, সামোয়া, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, তিমোর লেস্তে ও টুভালু।
অনেক দেশ অনলাইনে ই-ভিসা আবেদন করার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশি নাগরিকরা নিচের দেশগুলোর জন্য অনলাইনে আবেদন করতে পারেন।
আলবেনিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আজারবাইজান, বাহরাইন, বেনিন, বতসোয়ানা, বুরকিনা ফাসো, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, ইথিওপিয়া, গ্যাবন, জর্জিয়া, গিনি, ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, মালয়েশিয়া, মরিতানিয়া, মলদোভা, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সাও তোমে ও প্রিন্সিপে, সিঙ্গাপুর,সুরিনাম, সিরিয়া, তাজিকিস্তান, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ে।
কিছু দেশে ভ্রমণের আগে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন বা ইটিএ নিতে হয়। এটি মূলত একটি অনলাইন অনুমোদন প্রক্রিয়া, যা ভিসার মতো হলেও তুলনামূলক সহজ।
বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কেনিয়া, সেশেলস এবং শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণের জন্য বর্তমানে ইটিএ প্রয়োজন হতে পারে। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং সামান্য ফি জমা দিয়ে এই অনুমোদন নেওয়া যায়।
বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য বিশ্বভ্রমণের সুযোগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। যদিও অনেক দেশে এখনও ভিসা প্রয়োজন হয়, তবুও এশিয়া, আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা ব্যবস্থার সুবিধা রয়েছে।
ভ্রমণের আগে পাসপোর্টের মেয়াদ, পর্যাপ্ত অর্থের প্রমাণ, রিটার্ন টিকিট এবং সংশ্লিষ্ট দেশের প্রবেশ নীতিমালা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনা ও সর্বশেষ তথ্য জানা থাকলে বিদেশ ভ্রমণ আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত হতে পারে।
সূত্র : এ্যটলিস